কনটেন্ট আনলক করুন

এই লিংকটি ভিজিট করলে আপনি ১৬ ঘণ্টা কোনো পপআপ বিজ্ঞাপন ছাড়াই আমাদের ওয়েবসাইট ভিজিট করতে পারবেন।

পেজটির উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ভালোভাবে দেখে আসুন।

(লিংক লোড হতে কিছু সময় লাগতে পারে)


সুসন্তান লাভের উপায় (পর্ব-১): শুধুমাত্র ইচ্ছা করলেই হয় না, প্রয়োজন কঠোর তপস্যা ও প্রস্তুতি

February 18, 2026 2:23 PM
সুসন্তান লাভের উপায়

বর্তমান সময়ে প্রতিটি দম্পতিই চান তাদের কোল আলো করে আসুক একটি ফুটফুটে, সুস্থ এবং মেধাবী সন্তান। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, কেন একই পিতামাতার সব সন্তান সমান হয় না? কেন কারো সন্তান হয় মহামানব, আর কারো সন্তান সারাজীবন ভোগে রুগ্নতা বা অসৎ চরিত্রে? ১৯১৩ সালে প্রকাশিত শ্রী কামাখ্যাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ “সুসন্তান লাভের উপায়” এবং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোকে আজ আমরা জানব সুসন্তান লাভের সেই গোপন ভিত্তিপ্রস্তর সম্পর্কে, যা আজ প্রায় বিস্মৃত।

সুসন্তান লাভ: কৃষকের চাষাবাদের মতো একটি শিল্পঃ
সন্তান জন্ম দেওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি একটি সাধনা। আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে সন্তান উৎপাদনকে কৃষিকাজের সাথে তুলনা করা হয়েছে। একজন সুফলাকাঙ্ক্ষী কৃষক যেমন বীজ বপনের আগে জমিকে কর্ষণ করে আগাছামুক্ত ও উর্বর করে নেন, ঠিক তেমনি সুসন্তান কামনাকারী দম্পতিকেও সন্তান গ্রহণের বহু আগে নিজেদের দেহ ও মনকে প্রস্তুত করতে হয় ।

যদি জমি ঊষর হয় কিংবা বীজ রুগ্ন হয়, তবে যেমন ভালো ফসল আশা করা যায় না; তেমনি পিতামাতার শরীর ও মন যদি কলুষিত বা অসুস্থ হয়, তবে তাদের থেকে জন্ম নেওয়া সন্তান কখনোই শ্রেষ্ঠ গুণের অধিকারী হতে পারে না। শাস্ত্র বলছে, পুত্রকে পবিত্র ও উন্নত দেখতে চাইলে আগে নিজেকে উন্নত করুন, তারপর সন্তান উৎপাদনের কথা ভাবুন ।

ব্রহ্মচর্য: সুসন্তান লাভের মূল চাবিকাঠিঃ
আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থায় ‘ব্রহ্মচর্য’ শব্দটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। কিন্তু সুসন্তান লাভের এটিই প্রথম এবং প্রধান ধাপ। আর্য ঋষিরা বলতেন, আগে ব্রহ্মচারী থাকো, দেহ-মন গঠন করো, তারপর গার্হস্থ্য ধর্মে প্রবেশ করো ।

মহারাজ অশ্বপতির দৃষ্টান্তঃ

-মহাভারতের বনপর্বে একটি চমৎকার আখ্যান রয়েছে। মহারাজ অশ্বপতি এবং তাঁর ধর্মপত্নী একটি সুসন্তানের আশায় দীর্ঘ ১৮ বছর কঠোর নিয়ম ও ব্রহ্মচর্য পালন করেছিলেন । তাঁরা মিতাহারী ও জিতেন্দ্রিয় হয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করেছিলেন । এই দীর্ঘ তপস্যা ও সংযমের ফলেই তাঁরা লাভ করেছিলেন ‘সাবিত্রী’-র মতো মহীয়সী কন্যাকে, যিনি আজও ভারতীয় নারীজাতির আদর্শ ।

-প্রাচীনকালে রাজারাও জানতেন, ভোগের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ সন্তান পাওয়া যায় না; ত্যাগের মাধ্যমেই তা অর্জন করতে হয়। আজকের দিনে আমরা এই নিয়মগুলো উপেক্ষা করি বলেই আমাদের বংশধররা দিন দিন স্বাস্থ্যহীন, চরিত্রহীন ও মেধাহীন হয়ে পড়ছে ।

পিতামাতার সংযম ও আধুনিক বিজ্ঞানঃ
অনেকে ভাবতে পারেন, এগুলো কেবল পুরানো দিনের কথা। কিন্তু আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীরাও এই সত্যকে স্বীকার করেছেন। ১৯১৩ সালের বইটিতে বিখ্যাত সব ডাক্তার ও বিজ্ঞানীদের মতবাদ উদ্ধৃত করা হয়েছে যা আজও প্রাসঙ্গিকঃ

বিখ্যাত ডাক্তার নিকলস তাঁর ‘হিউম্যান ফিজিওলজি’ গ্রন্থে বলেছেন, একটি শিশুকে ‘Well Begotten’ বা উত্তমরূপে জন্মগ্রহণ করতে হলে পিতামাতাকে অবশ্যই সুস্থ জীবনযাপন করতে হবে। কোনো অসুখী, রুগ্ন, কিংবা অতিরিক্ত পরিশ্রমে ক্লান্ত ব্যক্তি কখনোই সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পারেন না ।

তিনি আরও গভীরে গিয়ে বলেছেন, মাদকাসক্ত বা স্নায়ুবিক দুর্বলতায় ভোগা পিতার বীর্য এবং অসুস্থ মাতার ডিম্বাণু কখনোই একটি শ্রেষ্ঠ প্রাণের সঞ্চার করতে পারে না। পিতামাতার প্রতিটি দোষ-গুণ, প্রতিটি মানসিক অবস্থা সন্তানের মধ্যে সঞ্চারিত হয় ।

আমেরিকার বিখ্যাত ডাক্তার জন কাউয়েন, এম.ডি. খুব কঠিন একটি সত্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, পৃথিবীতে দশ হাজার শিশুর মধ্যে হয়তো একটি শিশু পিতামাতার পূর্ণ সম্মতি, ভালোবাসা ও সুনিয়মের মাধ্যমে জন্ম নেয়। আর বাকি নয় হাজার নয়শ নিরানব্বই জন শিশু পিতামাতার অসতর্ক মুহূর্তের ফল বা ‘Accident’ হিসেবে পৃথিবীতে আসে, সাথে নিয়ে আসে পিতামাতার পুঞ্জীভূত পাপ ও দোষ ।

তিনি প্রশ্ন রেখেছেন, পৃথিবীতে কেন এত পাপ, এত রোগ, এত অকালমৃত্যু?
এর কারণ হলো—আমরা বীজ বপনের সময় কোনো নিয়ম মানি না। যতদিন না পিতামাতা এই ‘প্রি-নেটাল ল’ (Pre-natal laws) বা জন্মপূর্ব নিয়মগুলো মানবেন, ততদিন পৃথিবী থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর হবে না ।

মানসিক অবস্থার প্রভাব: এক চরম সত্যঃ
গর্ভসঞ্চারের মুহূর্তে পিতামাতার মনের অবস্থা কেমন ছিল, তার ওপর ভিত্তি করেই সন্তানের চরিত্র গঠিত হয়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র এবং চরক সংহিতা অনুযায়ী, সহবাসের সময় পিতামাতার মন যে ভাবাপন্ন থাকে, সন্তানও সেই স্বভাব পায় ।

বইটিতে একটি চমকপ্রদ ঘটনার উল্লেখ আছে। একজন খুনী আসামী আদালতে বিচারকের সামনে বলেছিল, “আমি সৎ হওয়ার অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। আমার পিতামাতা আমাকে যে শরীর ও মন দিয়ে গেছেন, তাতে পাপের বীজ ছিল। আমি জন্মগতভাবেই অপরাধপ্রবণ। তাই আমার এই অপরাধের জন্য আমার চেয়ে আমার পিতামাতার শাস্তি হওয়া উচিত” ।

এটি একটি ভয়ঙ্কর সতর্কবাণী। কোনো দম্পতি যদি রাগের মাথায়, অনিচ্ছায় কিংবা ঘৃণার সাথে মিলিত হন, তবে সেই মিলনে যে সন্তানের সৃষ্টি হবে, সে কখনোই শান্ত বা ধাৰ্মিক হতে পারে না ।

প্রস্তুতি পর্বে কী কী করণীয়?
সুসন্তান লাভের জন্য দম্পতিদের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলা উচিত, যা শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই তাদের প্রস্তুত করবে:

১. দেহশুদ্ধি ও মিতাহার:
অতিরিক্ত ভোজন, বা শরীর অসুস্থ থাকা অবস্থায় সন্তান গ্রহণ করা উচিত নয়। ডাক্তার ট্রল (Dr. Trall) বলেছেন, যখন পাকস্থলী ভারাক্রান্ত থাকে বা শরীর ক্লান্ত থাকে, তখন জীবনীশক্তি কমে যায় । তাই স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই হিতকর ও লঘু বস্তু ভোজন করতে হবে ।

২. মানসিক প্রশান্তি:
উদ্বেগ, ভয়, ক্রোধ বা শোকের সময় মিলন নিষিদ্ধ। চরক সংহিতায় বলা হয়েছে, স্ত্রী যদি ভীতা, শোকার্তা বা ক্রুদ্ধা হন, তবে তিনি গর্ভধারণ করলে সেই সন্তান বিকৃত বা স্বল্পায়ু হতে পারে ।

৩. ভগবানের আরাধনা:
আমাদের আর্য ঋষিরা মিলনের আগেও ভগবানের নাম স্মরণ করতে বলেছেন। “অহিরসি আয়ুরসি” ইত্যাদি মন্ত্র পাঠ করে বা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে তবেই এই পবিত্র কর্মে লিপ্ত হওয়া উচিত । কারণ, এটি কেবল ইন্দ্রিয়তৃপ্তি নয়, এটি একটি নতুন আত্মাকে পৃথিবীতে আহ্বান করার প্রক্রিয়া।

৪. নেশা ও ব্যভিচার বর্জন:
মদ্যপ অবস্থায় বা নেশাগ্রস্ত হয়ে সন্তান উৎপাদন করলে সেই সন্তান উন্মাদ বা স্নায়ুরোগী হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে । পিতামাতার রক্ত যদি বিষাক্ত হয়, সন্তানের রক্তও বিষাক্ত হবে।

উপসংহারঃ
শ্রেষ্ঠ সন্তান পেতে হলে আগে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মানুষ হতে হবে। ইতর প্রাণীরা কেবল প্রবৃতির বশে সন্তান জন্ম দেয়, কিন্তু মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব অনেক বেশি ।

আগামী পর্বে আমরা আলোচনা করব গর্ভধারণের সঠিক সময় ও কাল নিয়ে। জানব ঋতুকাল কী, কোন তিথিতে মিলন হলে পুত্র বা কন্যা সন্তান হয় এবং কোন দিনগুলো শাস্ত্র মতে বাচ্চার জন্য ভয়ঙ্কর হতে পারে। সেই পর্যন্ত আমাদের সাথেই থাকুন।

(বিঃদ্রঃ এই লেখাটি প্রাচীন গ্রন্থ ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে রচিত। ব্যক্তিগত জীবনে প্রয়োগের আগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা অভিজ্ঞ জ্যোতিষীর পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।)


Facebook

Join Now

YouTube

Join Now

Related Stories

Leave a Comment